কোলকাতা
মায়াবী ঘড়ির কারিগর
আপনি কি একটি লোমহর্ষক মায়াবী ঘড়ির কারিগর রহস্যময় গল্প খুঁজছেন? কলকাতার পুরনো অলিগলির একটা নিজস্ব ভাষা আছে। সেখানে সোঁদা ধুলোর গন্ধে লুকিয়ে থাকে কত শত বছরের না বলা ইতিহাস।
উত্তর কলকাতার এমনই এক ঝুপসি গলির শেষে অবস্থিত ‘কালচক্র’। নামটা শুনে মনে হতে পারে এটি কোনো সাধারণ ঘড়ির দোকান, কিন্তু এর ভেতরে পা রাখলে যে কেউ বিভ্রান্ত হতে বাধ্য। দেয়াল জুড়ে ছোট-বড় হাজারো ঘড়ি, কোনোটা কাঠের, কোনোটা পিতলের, আবার কোনোটা নাম না জানা কোনো ধাতু দিয়ে তৈরি। সবকটি ঘড়ির টিকটিক শব্দ যখন একত্রে মিলিত হয়, তখন মনে হয় যেন কোনো এক আদিম ড্রামের শব্দে সময় নিজেই তাল মেলাচ্ছে।
ADVERTISEMENT
Inline Rectangle Ad (336×280)
প্রথম অধ্যায়: অবিনাশ বাবু ও সেই রহস্যময় উপহার
অনিরুদ্ধ একজন তরুণ সাংবাদিক। গত কয়েক মাস ধরে সে একটি রহস্যময় বিষয় নিয়ে গবেষণা করছে—শহরের এমন সব মানুষ যারা হঠাৎ করে নিখোঁজ হয়ে যায় এবং ফিরে আসার পর তারা অদ্ভুত আচরণ করে। এই সূত্র ধরেই সে পৌঁছাল ‘কালচক্র’-এর মালিক অবিনাশ বাবুর কাছে। অবিনাশ বাবু মানুষটি যেন নিজে এক রহস্য। তার পরনে সবসময় একটি ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর চোখে মোটা কাঁচের চশমা।
সেদিন বিকেলে দোকানটিতে অন্য কোনো ক্রেতা ছিল না। অবিনাশ বাবু টেবিলে ঝুঁকে এক প্রাচীন পকেট ঘড়ি মেরামত করছিলেন। অনিরুদ্ধর উপস্থিতি বুঝতে পেরে তিনি চশমাটি কপালের ওপর তুলে বসলেন। “সময়কে বন্দি করতে এসেছো নাকি সময়ের সাথে তাল মেলাতে?” বৃদ্ধের গলার স্বর কোনো পুরনো বাঁশির সুরের মতো শোনাল। অনিরুদ্ধ ইতস্তত করে বলল, “আমি কিছু পুরনো ঘটনার উত্তর খুঁজছি। বিশেষ করে এই দোকান নিয়ে প্রচলিত লোককথাগুলো।” অবিনাশ বাবু একটি ম্লান হাসি হাসলেন এবং ড্রয়ার থেকে একটি ব্রোঞ্জের পকেট ঘড়ি বের করলেন। এটি ছিল সেই রহস্যময় গল্প-এর মূল কেন্দ্রবিন্দু।
Middle Square Ad (300×250)
দ্বিতীয় অধ্যায়: সময় যখন হাতের মুঠোয়
অনিরুদ্ধ ঘড়িটি হাতে নিতেই অনুভব করল সেটি মৃদু স্পন্দিত হচ্ছে, যেন কোনো জীবন্ত প্রাণীর হৃৎপিণ্ড। ঘড়ির গায়ে অদ্ভুত সব জ্যামিতিক নকশা খোদাই করা ছিল, যা সে আগে কখনও দেখেনি। বৃদ্ধ বললেন, “এই ঘড়ির মাঝখানের বোতামটি যদি তুমি তিনবার স্পর্শ করো, তবে বর্তমান পৃথিবী তোমার কাছে স্থির হয়ে যাবে। তুমি সময়ের নদী থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারবে। তবে মনে রেখো অনিরুদ্ধ, যে ঘড়ি সময়কে থামায়, সে প্রাণকেও স্থির করে দেয়।”
কৌতূহলী অনিরুদ্ধ ঘড়িটি পকেটে নিয়ে বাড়ি ফিরল। সে রাতে যখন সারা শহর নিস্তব্ধ, সে পরীক্ষা করার জন্য তিনবার ঘড়ির বোতাম চাপল। সাথে সাথে একটা অদ্ভুত নীল আলোয় ঘরটি ভরে উঠল। জানালার বাইরে উড়তে থাকা একটি পতঙ্গ স্থির হয়ে গেল, দেয়াল ঘড়ির টিকটিক বন্ধ। অনিরুদ্ধ অবাক হয়ে দেখল সে নড়াচড়া করতে পারছে, কিন্তু বাকি পৃথিবী পাথরের মতো নিথর। সে জানত না, এই ক্ষমতার পেছনে কত বড় এক অন্ধকার লুকিয়ে আছে।
“মানুষ যখন সময়ের শাসন ভাঙতে চায়, সময় তখন মানুষকে শাসাতে শুরু করে।” – অনিরুদ্ধর ডায়েরির একটি লাইন।
তৃতীয় অধ্যায়: ক্ষমতার অপব্যবহার ও পরিণাম
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ অনিরুদ্ধ এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে কাটাল। সে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সময় থামিয়ে দিত। সে দেখত মানুষের অজান্তেই কত কিছু ঘটে যাচ্ছে। সে মানুষের সাহায্য করতে শুরু করল। দুর্ঘটনায় পড়তে যাওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধার করা বা চুরি হতে যাওয়া দোকান বাঁচানো—অনিরুদ্ধ হয়ে উঠল এক অদৃশ্য নায়ক। কিন্তু এই ক্ষমতার প্রতিটি ব্যবহারের সাথে সাথে সে লক্ষ্য করল তার শারীরিক পরিবর্তন ঘটছে। তার চুল দ্রুত ধূসর হয়ে যাচ্ছে, হাড়ের জয়েন্টে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়েছে। সে বুঝতে পারল, সে পৃথিবী থেকে যত মিনিট ‘চুরি’ করছে, প্রকৃতি তার জীবনীশক্তি থেকে তত মিনিট ‘কেটে’ নিচ্ছে।
একদিন সে আয়নায় তাকিয়ে আঁতকে উঠল। মাত্র পঁচিশ বছরের যুবকের চেহারায় বলিরেখা দেখা দিয়েছে। চোখের নিচে গভীর কালো দাগ। সে বুঝতে পারল, এই ঘড়ি আসলে একটি ভ্যাম্পায়ার বা রক্তচোষা যন্ত্রের মতো তার আয়ু শুষে নিচ্ছে। সে সময়কে নিয়ন্ত্রণ করছে না, বরং সময় তাকে গ্রাস করছে। সে এক বিশাল রহস্যময় গল্প–এর ট্র্যাজিক হিরো হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অপ্রত্যাশিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: সময়ের চোরাবালি
অনিরুদ্ধ যখন প্রথমবার সময় থামিয়েছিল, তখন সে ভেবেছিল সে অমরত্ব পেয়ে গেছে। কিন্তু তার চারপাশের মানুষগুলো তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। সে যতবার সময়কে থামিয়ে নিজের কাজ গুছিয়ে নিত, ততবার সে বাস্তব জগত থেকে কয়েক মিলিমিটার করে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছিল। তার বন্ধু-বান্ধবদের কাছে সে হয়ে উঠছিল এক আতঙ্ক। কেউ তাকে ফোন করলে পেত না, আবার দেখা হলেও দেখত অনিরুদ্ধর চোখের এক অদ্ভুত শূন্যতা।
একদিন দুপুরে সে যখন গঙ্গার ঘাটে বসে ছিল, হঠাৎ তার মনে হলো পৃথিবীর গতি যেন স্বাভাবিকের চেয়েও ধীর হয়ে গেছে। সে ঘড়ি স্পর্শ করেনি, তবুও কেন এমন হচ্ছে? সে বুঝতে পারল, অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে ঘড়িটি এখন তার স্নায়ুতন্ত্রের সাথে মিশে গেছে। সে এখন চাইলেও আর সাধারণ মানুষ হতে পারবে না। সে এক জীবন্ত টাইমিং মেশিন হয়ে উঠেছে। তার প্রতিটি নিঃশ্বাস এখন সেকেন্ডের কাঁটার সাথে তাল মিলিয়ে চলে। এই শহরের কলকাতা শহরের ইতিহাসেও হয়তো এমন কোনো ঘটনা আগে ঘটেনি।
অবিনাশ বাবুর ডায়েরি: সত্যের মুখোমুখি
অনিরুদ্ধ হাল ছাড়ল না। সে আবার সেই পুরনো গলিতে ফিরে গেল। এবার সে একটি পোড়া ডায়েরির অংশ খুঁজে পেল। সেখানে লেখা ছিল, “এই ঘড়িটি ২০২৬ সালে একদল বিজ্ঞানী তৈরি করেছিলেন যারা সময় ভ্রমণ নিয়ে গবেষণা করছিলেন। কিন্তু তারা জানতেন না যে সময়কে কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করলে মহাবিশ্বের ভারসাম্য নষ্ট হয়। যে এই ঘড়ি পরবে, সে হবে সময়ের রক্ষক অথবা সময়ের বলি।”
ডায়েরির পাতায় অনিরুদ্ধ নিজের ছবি দেখতে পেল। তার মানে, অবিনাশ বাবু আসলে কে ছিলেন? তিনি কি অনিরুদ্ধরই ভবিষ্যৎ রূপ? এই চিন্তাটি তাকে কুড়ে কুড়ে খেতে লাগল। সে বুঝতে পারল তাকে এই লুপ বা চক্রটি ভাঙতেই হবে। নতুবা সে নিজেই একদিন অবিনাশ বাবু হয়ে এই দোকানে বসে থাকবে অন্য কোনো যুবকের অপেক্ষায়।
আরও পড়ুন: আপনি কি আমাদের অন্য একটি রোমাঞ্চকর কাহিনী পড়েছেন? ধারাবাহিক মেগাসিরিয়াল বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পী সিঙ্গার নাইমার জিবন কাহিনী পড়ুন 👉 সিঙ্গার নাইমা
চতুর্থ অধ্যায়: কালচক্রের রহস্য ফাঁস
অনিরুদ্ধ পাগলের মতো আবার অবিনাশ বাবুর দোকানে দৌড়ে গেল। কিন্তু সেখানে পৌঁছে সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দোকানের সাইনবোর্ডটি আধপোড়া, ভেতরে মাকড়সার জাল আর ধুলোর আস্তরণ। প্রতিবেশীরা তাকে জানাল, এই দোকানটি গত পঁচিশ বছর ধরে বন্ধ। অবিনাশ বাবু নামের কেউ এখানে কোনোদিন ছিল না। অনিরুদ্ধ আতঙ্কিত হয়ে পকেট থেকে ঘড়িটি বের করল। এবার দেখল ঘড়ির পেছনের ঢাকনাটি আলগা হয়ে গেছে। সেখানে ক্ষোদাই করা একটি তারিখ: ২০২৬ সাল। সে চমকে উঠল। এটা তো বর্তমান সময়ের নয়, ভবিষ্যতের কোনো যন্ত্র!
সে বুঝতে পারল সে এক গভীর টাইম লুপে ফেঁসে গেছে। এই রহস্যময় গল্পটির প্রতিটি অংশ যেন আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। অনিরুদ্ধর জীবনের প্রতিটি সেকেন্ড এখন সেই ঘড়িটির নিয়ন্ত্রণে। তাকে এই লুপ ভাঙতে হবে, নতুবা সে সময়ের গহ্বরে বিলীন হয়ে যাবে।
পঞ্চম অধ্যায়: চূড়ান্ত লড়াই ও ত্যাগের মহিমা
অনিরুদ্ধর শরীর তখন নব্বই বছরের বৃদ্ধের মতো ভেঙে পড়েছে। তার মা তখন মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে। সে জানত ঘড়িটি ব্যবহার করলে সে আর বাঁচবে না, কিন্তু মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে তাকে সময়ের নিয়ম আর একবার ভাঙতে হলো। সে ঘড়িটি এমনভাবে ঘোরাল যা আগে কখনও করেনি। সে নিজের সমস্ত আয়ু উৎসর্গ করল তার মায়ের প্রাণের বিনিময়ে। এক তীব্র বিস্ফোরণ আর নীল আলোর শিখায় পুরো অন্ধকার ঘরটি আলোকিত হয়ে উঠল।
গল্পটি কেমন লাগল? আমাদের এই রহস্যময় গল্পটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে তবে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন।



