শহরের ঘিঞ্জি গলির শেষ প্রান্তে যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছাতেও দ্বিধা করে, সেখানে অবস্থিত ‘কালচক্র’। দোকানটি যতটা না ব্যবসার, তার চেয়ে বেশি যেন এক ইতিহাসের সংগ্রহশালা। দোকানের মালিক অবিনাশ বাবু। বয়স কত তা কেউ জানে না, তবে তার সাদা চুল আর কুঁচকানো চামড়া বলে দেয় তিনি বহু বসন্ত পার করেছেন। অনিরুদ্ধ, পেশায় একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, পুরনো জিনিসের প্রতি তার অগাধ টান। সেই টান থেকেই একদিন সে পা রাখল এই রহস্যময় ঘড়ির দোকানে।
প্রথম অধ্যায়: একটি প্রাচীন উপহার ও স্তব্ধ সময়
দোকানের ভেতরটা ধূপের গন্ধে ম ম করছে। দেয়ালে টাঙানো শত শত ঘড়ি একসাথে টিকটিক শব্দ করছে। অবিনাশ বাবু একটি টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে কাজ করছিলেন। অনিরুদ্ধর উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি মুখ তুললেন। তার চোখ দুটো যেন জ্বলজ্বল করছে। কোনো ভূমিকা ছাড়াই তিনি ড্রয়ার থেকে একটি ব্রোঞ্জের পকেট ঘড়ি বের করলেন।
ঘড়িটির ওপর অদ্ভুত সব জ্যামিতিক নকশা। তাতে রোমান হরফ বা সংখ্যা নেই, আছে নক্ষত্রপুঞ্জের মতো কিছু চিহ্ন। অবিনাশ বাবু ধীর গলায় বললেন, “অনিরুদ্ধ, এই ঘড়িটি শুধু সময় দেখায় না, এটি সময়কে অনুভব করে। এটি তোমাকে এমন কিছু দিতে পারে যা পৃথিবীর কোনো ধনকুবের কিনতে পারবে না। কিন্তু মনে রেখো, সময়ের ঋণ বড় ঋণ।”
অনিরুদ্ধ ঘড়িটি হাতে নিতেই এক অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করল। তার মনে হলো ঘড়ির ভেতর থেকে একটা মৃদু স্পন্দন তার হৃদস্পন্দনের সাথে মিশে যাচ্ছে। সে ঘড়িটি কিনে বাড়ি ফিরল। রাত তখন ঠিক ১২টা। অনিরুদ্ধ ঘড়ির মাঝখানের বোতামটি চাপ দিতেই হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেল। ফ্যানের ঘোরা বন্ধ, জানালার বাইরে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যেন কাঁচের বলের মতো শূন্যে ঝুলে আছে। সে বুঝতে পারল, সে সময়কে স্থির করে ফেলেছে।
দ্বিতীয় অধ্যায়: ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রকৃতির সংকেত
প্রথম কয়েকদিন অনিরুদ্ধর কাছে এটি ম্যাজিকের মতো মনে হলো। সে এই ক্ষমতার অদ্ভুত সব ব্যবহার শুরু করল। সে রাস্তায় বেরোত, সময় থামিয়ে দিয়ে মানুষের পকেট থেকে টাকা নিত না ঠিকই, কিন্তু সে বড় বড় মানুষের গোপন নথি পড়ে ফেলত। একবার সে দেখল একটি ছোট বাচ্চা দ্রুতগামী ট্রাকের সামনে পড়ে যাচ্ছে। অনিরুদ্ধ সময় থামিয়ে বাচ্চাটিকে সরিয়ে দিয়ে এল। এটি ছিল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ।
কিন্তু ধীরে ধীরে তার মধ্যে এক ধরনের অহংকার কাজ করতে শুরু করল। সে ভাবল সে নিজেই ঈশ্বর। তবে এই আনন্দের মাঝেও একটি অস্বস্তি তাকে তাড়া করছিল। সে লক্ষ্য করল, যতবার সে সময় থামাচ্ছে, তার নিজের শরীর চরম ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে আঁতকে উঠল। তার গালের হাড় বেরিয়ে এসেছে, চোখের নিচে কালি। মাত্র ২৫ বছর বয়সে তাকে ৪০ বছরের প্রৌঢ়ের মতো দেখাচ্ছে।
“প্রকৃতির প্রতিটি সেকেন্ডের একটি দাম আছে। তুমি যদি অন্যের থেকে সময় চুরি করো, প্রকৃতি তোমার আয়ু থেকে তা কেটে নেবে।” – এই কথাটি অনিরুদ্ধর মাথায় বজ্রপাতের মতো আঘাত করল।
তৃতীয় অধ্যায়: অবিনাশ বাবুর অন্তর্ধান ও সত্যের সন্ধান
অনিরুদ্ধ পাগলের মতো দৌড়ে গেল ‘কালচক্র’ দোকানে। কিন্তু সেখানে গিয়ে সে যা দেখল তার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না। দোকানের জায়গায় একটি পুরনো ভাঙা গুদাম ঘর। প্রতিবেশীরা জানাল, এখানে গত ২০ বছর ধরে কোনো দোকান ছিল না। অনিরুদ্ধর মাথার ভেতরটা চক্কর দিয়ে উঠল। তবে অবিনাশ বাবু কে ছিলেন? তিনি কি কোনো অশরীরী আত্মা, নাকি সময়ের কোনো দূত?
সে বাড়ি ফিরে ঘড়িটি পরীক্ষা করতে শুরু করল। ঘড়ির পেছনের ঢাকনা খুলতেই সে দেখল সেখানে ক্ষুদ্র অক্ষরে লেখা আছে: “Tempus Edax Rerum” (সময় সব কিছু ভক্ষণ করে)। সে বুঝতে পারল, সে একটি মরণফাঁদে পা দিয়েছে। সে যতবার সময় থামিয়ে ভালো বা মন্দ কাজ করেছে, তার বিনিময়ে তার জীবনের জীবনীশক্তি ওই ঘড়িটি শুষে নিয়েছে।
চতুর্থ অধ্যায়: শেষ লড়াই ও ত্যাগের মহিমা
অনিরুদ্ধ ঠিক করল সে আর এই ঘড়ি ব্যবহার করবে না। কিন্তু নিয়তি তাকে ছাড়ল না। তার মা হঠাৎ মারাত্মক হৃদরোগে আক্রান্ত হলেন। ডাক্তার জানালেন, হাসপাতালে নিতে ১০ মিনিট দেরি হলেও তাকে বাঁচানো যাবে না। শহরের যানজট তখন চরমে। অনিরুদ্ধর সামনে একটিই পথ— সময় থামিয়ে দিয়ে মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া।
সে জানত, এবার যদি সে সময় থামায়, তবে হয়তো তার নিজের প্রাণপ্রদীপ নিভে যাবে। কিন্তু মায়ের জন্য সে এই ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ছিল। সে ঘড়ির বোতাম টিপল। পুরো শহর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সে তার মাকে পাঁজাকোলা করে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে হাসপাতালের দিকে দৌড়াতে শুরু করল। প্রতিটি পদক্ষেপে তার মনে হচ্ছিল কেউ তার বুক থেকে প্রাণবায়ু টেনে বের করে নিচ্ছে। তার চুল সাদা হয়ে গেল, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল।
হাসপাতালের গেটে পৌঁছানোর সাথে সাথে সে সময়কে আবার স্বাভাবিক করে দিল। ডাক্তাররা তার মাকে নিয়ে ভেতরে চলে গেলেন। অনিরুদ্ধ তখন মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছে। সে অনুভব করল তার শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে।
উপসংহার: সময়ের মুক্তি
অনিরুদ্ধর ঝাপসা চোখের সামনে হঠাৎ অবিনাশ বাবু এসে দাঁড়ালেন। এবার তার পোশাকে এক স্বর্গীয় আভা। তিনি বললেন, “অনিরুদ্ধ, তুমি নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে অন্যের জন্য তোমার শেষ সময়টুকু বিলিয়ে দিয়েছ। এই ত্যাগই তোমাকে মুক্তি দেবে।”
অবিনাশ বাবু ঘড়িটি অনিরুদ্ধর হাত থেকে নিলেন এবং মুহূর্তের মধ্যে তা ধুলোয় মিশে গেল। অনিরুদ্ধ অনুভব করল এক বিশাল বোঝা তার ওপর থেকে নেমে গেছে। তার শরীরে আবার নতুন প্রাণশক্তি ফিরে এল। আয়নায় তাকিয়ে সে দেখল সে আবার সেই তরুণ অনিরুদ্ধ।
পরদিন সকালে সে নদীর পাড়ে বসে সূর্যোদয় দেখছিল। সে বুঝল, প্রতিটি মুহূর্ত কত মূল্যবান। আমরা সময়কে ধরে রাখতে পারি না, কিন্তু প্রতিটি মুহূর্তকে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিতে পারি। এই রহস্যময় গল্পটি তাকে শিখিয়ে দিল যে, ঘড়ির কাঁটা নয়, জীবনের স্পন্দনই আসল সময়।
সম্পর্কিত বিজ্ঞাপন
গল্পটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। আপনি কি এই ধরণের আরও রোমাঞ্চকর কাহিনী পড়তে চান? আমাদের কমেন্ট করে জানান।



